ধূমকেতু নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব)-এর ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
সমাজে সংঘটিত বিভিন্ন ঘৃণ্য ও চাঞ্চল্যকর অপরাধের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে মাদক এবং জুয়া (গ্যাম্বলিং) বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব)-এর ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
অপরাধের মূল কারণ উদ্ঘাটনের ওপর গুরুত্বারোপ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অপরাধ কেবল একটি বাহ্যিক উপসর্গ , এর মূল কারণ অনুসন্ধান করে গোড়ায় আঘাত করতে হবে। সমাজে সংঘটিত বিভিন্ন ঘৃণ্য ও চাঞ্চল্যকর অপরাধ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে মাদক এবং জুয়া (গ্যাম্বলিং)।’
এ সময় অপরাধমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনে ক্রাইম রিপোর্টারদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।তিনি বলেন, ‘অপরাধমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গঠনে অপরাধ (অনুসন্ধানী) সাংবাদিক তথা ক্রাইম রিপোর্টারদের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরণ বদলে এখন আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ও ডিজিটাল রূপ নিয়েছে। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অপরাধ দমন ও প্রতিরোধে আধুনিক আইনি কাঠামোর পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল এবং বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করা অপরিহার্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘অপরাধ, অপরাধী, অপরাধবিজ্ঞান, পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—এগুলো গভীরভাবে সম্পর্কিত। অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তথ্য প্রদান ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য ক্র্যাবের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘৩১৮ জন পেশাদার সদস্য নিয়ে দীর্ঘ ৪৩ বছরের যাত্রায় ক্র্যাব অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা একটি উচ্চমানের জ্ঞানভিত্তিক শাখা, যেখানে গভীর পড়াশোনা ও তথ্য-বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়।’
অপরাধের মূল কারণ উদ্ঘাটনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘অপরাধীকে সাজা দেওয়ার পাশাপাশি সমাজকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে—কেন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অপরাধের উৎসমুখে সমাধান আনতে পারলে সমাজ থেকে অপরাধের হার কার্যকরভাবে হ্রাস করা সম্ভব হবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ক্রাইম রিপোর্টাররা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করেন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেসব ক্রাইম রিপোর্টার ক্ষতিগ্রস্ত বা আহত হন, সিএসআর ফান্ডের মাধ্যমে বা অন্য কোনো মাধ্যমে তাদের সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি, পেশাগত শ্রেষ্ঠত্ব ও ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের স্বীকৃতি হিসেবে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে সনদ প্রদান করা যায় কি-না, সে বিষয়েও আইনগত দিক পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ বলে অভিহিত করে মন্ত্রী বলেন, ‘সাংবাদিকরা যদি সমাজের প্রতি তাদের অর্পিত দায়বদ্ধতা সঠিকভাবে পালন করেন, তবে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অপরাধ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র যা চায় এবং সমাজ যা আশা করে, তা বাস্তবায়নে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সাংবাদিকদের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।’
অ্যাসিড অপরাধ দমনে অতীতের সফলতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে অ্যাসিড নিক্ষেপ রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কঠোর আইনি কাঠামো, গণমাধ্যমের বলিষ্ঠ ভূমিকা এবং ব্যাপক সামাজিক সচেতনতার সম্মিলিত প্রয়াসে আজকে দেশে অ্যাসিড সম্পর্কিত অপরাধ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।’
একইভাবে মাদক ও অনলাইন জুয়াসহ অন্যান্য অপরাধ নির্মূল করতেও সাংবাদিক, রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন বলে তিনি এ সময় উল্লেখ করেন।
অনলাইন জুয়া ও মাদক নির্মূলে আইনি কাঠামো সংস্কারের বিষয় তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাচীন আইনগুলোর আধুনিকায়ন আবশ্যক।’
তিনি বলেন, ‘দেড়শত বছরের পুরোনো গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট (১৮৬৭) পরিবর্তন করে ডিজিটাল স্পেসে অনলাইন জুয়া, ম্যাচ ফিক্সিং ও সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র মোকাবেলায় ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। তাছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুর্বল আইনের ফাঁক গলে যেন অপরাধীরা পার না পেতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার ও নতুন আইন প্রণয়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’
ক্র্যাবের সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) (সচিব পদমর্যাদা) মো. রাশেদ খাঁন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ক্র্যাবের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ।
বক্তারা ক্র্যাবের দীর্ঘ ৪৩ বছরের অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ধারা অব্যাহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পরে মন্ত্রী কেকে কেটে ক্র্যাবের ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।


