ধূমকেতু প্রতিবেদক,সিরাজগঞ্জ : পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তোলার লক্ষ্যে বটগাছ রোপণ ও সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন দুইবার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিবেশকর্মী মাহবুবুল ইসলাম পলাশ। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নিরলসভাবে কাজ করছেন তিনি। তাঁর এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য প্রকৃতিকে রক্ষা করা, পাখিদের আবাসস্থল তৈরি করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।মাহবুবুল ইসলাম পলাশ সিরাজগঞ্জের ‘পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালা’র পরিচালক। ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অর্থায়নে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষরোপণ, বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বৃক্ষ বিতরণ এবং পরিবেশবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। তাঁর মতে, বৃক্ষরোপণ শুধু সবুজায়নের জন্য নয়; বরং অসংখ্য পাখি, কীটপতঙ্গ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল তৈরির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে বটগাছের প্রতি তাঁর রয়েছে বিশেষ আগ্রহ। একটি পরিণত বটগাছকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে অসংখ্য পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এর বিস্তৃত ডালপালা পাখিদের বসা, বিশ্রাম নেওয়া ও বাসা তৈরির উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে। বটগাছের ফল বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। পাশাপাশি এর বিশাল ছায়া স্থানীয় পরিবেশকে শীতল রাখতে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।বর্তমানে নগরায়ণ, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, জলাভূমি ভরাট এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে অনেক পাখি ও বন্যপ্রাণী তাদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র হারাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বট, অশ্বত্থ ও পাকুড়সহ দেশীয় বড় বৃক্ষ রোপণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন পলাশ। তাঁর মতে, প্রতিটি গ্রাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তার পাশের উপযুক্ত স্থান এবং বিভিন্ন জনপদে পাখিবান্ধব দেশীয় বৃক্ষ রোপণ করা প্রয়োজন।দীর্ঘ ২৬ বছরের পরিবেশবিষয়ক কার্যক্রমে তিনি দেশের ৬৪ জেলায় বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ করেছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত তাঁর উদ্যোগে ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি গাছ রোপণ ও বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশীয়, বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বিভিন্ন বৃক্ষ। পাশাপাশি তাঁর নিজস্ব বৃক্ষ সংগ্রহশালায় ৩৪৫ প্রজাতির বিরল ও বিপন্ন বৃক্ষ রয়েছে।
তাঁর পরিবেশবিষয়ক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বৃক্ষ সংরক্ষণ, বিনামূল্যে চারা বিতরণ, পাখিদের জন্য ফলদ বৃক্ষ রোপণ, পাখির আবাসস্থল তৈরি, পলিথিনবিরোধী প্রচারণা, শব্দদূষণ প্রতিরোধ এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টি। এসব কার্যক্রমের বড় একটি অংশ তিনি নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালনা করে আসছেন।পরিবেশ সংরক্ষণে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মাহবুবুল ইসলাম পলাশ অর্জন করেছেন বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার ২০২২ এবং জাতীয় কৃষি পুরস্কার ১৪২৬।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তিনি সম্মাননা ও স্বীকৃতি পেয়েছেনমাহবুবুল ইসলাম পলাশ বলেন, “একটি বটগাছ শুধু একটি গাছ নয়, এটি অসংখ্য পাখি ও প্রাণীর আশ্রয়স্থল। আমরা যদি প্রকৃতিকে বাঁচাতে চাই, তাহলে পাখিদের জন্যও গাছ লাগাতে হবে। শুধু গাছ লাগালেই হবে না, গাছগুলোকে বড় হওয়া পর্যন্ত পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করতে হবে। আমি চাই, প্রতিটি এলাকায় বট, অশ্বত্থ, পাকুড়সহ দেশীয় বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে উঠুক।”তিনি আরও বলেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্ব শুধু কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের নয়; এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে দেশীয় বৃক্ষ রোপণ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে।বটগাছের মতো দীর্ঘজীবী দেশীয় বৃক্ষ রোপণ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে পাখি এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলাই তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। তাঁর প্রত্যাশা, বৃক্ষরোপণ কেবল আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হবে।


