ধূমকেতু নিউজ ডেস্ক : ইউক্রেনে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। এসব হামলায় কোকা-কোলা, পেপসিকো ও ম্যাকডোনাল্ডসের মতো বড় মার্কিন প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এসব ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তেমন কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
অন্যদিকে, রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করতে কিয়েভের ওপর চাপ বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, এসব হামলার কারণে মার্কিন ভোক্তাদের ক্ষতি হচ্ছে এবং জ্বালানির দাম বাড়ছে।
মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে রুশ হামলার ঘটনায় প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইউক্রেনে ব্যবসা করা মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, বিদেশে মার্কিন কোম্পানিগুলো আক্রান্ত হলে নিজ দেশের সরকারের কাছ থেকে সুরক্ষা ও সমর্থন প্রত্যাশা করা স্বাভাবিক।
কোকা-কোলা, পেপসিকো ও ম্যাকডোনাল্ডসে হামলা
ইউক্রেনে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি হান্ডারের বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, গত কয়েক মাসে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি পরিচিত ব্র্যান্ডের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোকা-কোলা, পেপসিকো, ম্যাকডোনাল্ডস ও ওরিওর নাম রয়েছে।
হান্ডার বলেন, অতীতেও রাশিয়া ইউক্রেনে মার্কিন ব্যবসার অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যা ঘটছে, তা আগে দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, ‘ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সরাসরি আঘাত করা হচ্ছে। বারবার একই ধরনের হামলা চালানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে, মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোই তাদের লক্ষ্য।’
হান্ডারের ভাষ্য, ‘আমরা হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখতে পাচ্ছি না। এসব হামলা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কারণ, এখানে মার্কিন স্বার্থ, মার্কিন অর্থ ও মার্কিন বিনিয়োগকারীরা আক্রান্ত হচ্ছেন।’
কিয়েভের কাছে কোকা-কোলার কারখানায় হামলা
গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের বাইরে কোকা-কোলার একটি কারখানায় ড্রোন হামলা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর রাতে দেওয়া এক ভিডিও ভাষণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা।
তিনি বলেন, ‘আজ রাশিয়া ড্রোন দিয়ে কোকা-কোলার একটি কারখানায় হামলা চালিয়েছে। কোকা-কোলা তাদের কাছে এমন শত্রু হয়ে উঠেছে যে তারা ইরানের নকশায় তৈরি শাহেদ ড্রোন দিয়ে সেটি পুড়িয়ে দিচ্ছে।’
জেলেনস্কির বক্তব্য, রাশিয়া নিশ্চয়ই জানে যে কোকা-কোলা একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান। তাই এই হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি রাশিয়ার স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা উচিত।
ম্যাকডোনাল্ডসের গুদাম ধ্বংস, কমেছে খাবারের তালিকা
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে রুশ ড্রোন হামলায় ম্যাকডোনাল্ডসের একটি গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গুদামটি কিয়েভ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, ২৫ সেপ্টেম্বর একটি ড্রোন হামলায় গুদামটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ম্যাকডোনাল্ডস ইউক্রেনও এক বিবৃতিতে ঘটনাটি নিশ্চিত করে।
জেলেনস্কি বলেন, সাধারণ খাদ্যপণ্যের গুদামেও হামলা চালানো হচ্ছে। তার অভিযোগ, রাশিয়া ক্রমাগত হামলার পরিধি বাড়াচ্ছে। মার্কিন ও অন্যান্য দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, তথ্যকেন্দ্র এবং ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও এখন হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।
গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউক্রেনের ম্যাকডোনাল্ডসের রেস্তোরাঁগুলোতে খাবারের তালিকা সীমিত করতে হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ছাড়া আগস্টের শেষ দিকে পেপসিকো জানায়, ইউক্রেনের মিকোলাইভ অঞ্চলে তাদের একটি উৎপাদনকেন্দ্র রুশ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।
মার্কিন কোম্পানিগুলোর মধ্যে মতভেদ
ইউক্রেনে কার্যক্রম চালানো মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সবাই হামলার বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে আগ্রহী নয়। কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরতে চায়, আবার অন্যরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে হামলার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনা নিয়ে একমত নেই।
হান্ডারও বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠান চায় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এ বিষয়ে সরব হোক। তবে অন্যরা খুব সাবধানে এগোচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা এরই মধ্যে হোয়াইট হাউজকে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষায় আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা রাশিয়ার হামলার নিন্দা জানানোরও দাবি তুলেছেন।
ইউক্রেনও এসব হামলার বিষয়টি তুলে ধরে বলছে, দেশটিতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ রাখতে আরও প্রতিরক্ষা সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
হোয়াইট হাউজের সঙ্গে বৈঠক চেয়েও সাড়া পায়নি চেম্বার
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি হান্ডার জানিয়েছেন, গত মাসে তারা মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ করেছিলেন।
বৈঠকে ইউক্রেনে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক হামলার বিষয়ে তাদের জানাতে চেয়েছিল সংগঠনটি।
হান্ডার বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে কোনো সাড়া পাইনি।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার যখন মার্কিন ব্যবসার স্বার্থ রক্ষার কথা বলে, তখন বিদেশে মার্কিন কোম্পানিগুলো আক্রান্ত হলে কেন তাদের পাশে দাঁড়ানো হচ্ছে না।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিকের মতে, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী মহলে এমন ধারণা রয়েছে যে ইউক্রেন বিষয়ে মূলত উইটকফ ও কুশনারই কথা বলবেন। অন্যরা এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তাদের নিরুৎসাহিত করা হয়।
এ কারণে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা।
ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা নিয়ে ট্রাম্পের চাপ
রাশিয়ার হামলার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীরবতা আরও স্পষ্ট হয়েছে ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা নিয়ে তাদের কঠোর অবস্থানের কারণে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গত বছরের শেষ দিকে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগর উপকূলের একটি তেল স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলার কারণে কাজাখস্তানে মার্কিন বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কিয়েভকে সতর্ক করেছিল ওয়াশিংটন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়ার ডিজেল উৎপাদনকেন্দ্রে ইউক্রেনের হামলাকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের কারণেও জ্বালানির দাম বেড়েছে।
গত শুক্রবার ট্রাম্প রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার একটি চুক্তির ঘোষণা দেন। সমালোচকদের দাবি, এ পদক্ষেপ মার্কিন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ ছাড়া ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ না করলে দেশটিকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ সীমিত করার হুমকিও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
সূত্র: সিএনএন



