ধূমকেতু প্রতিবেদক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ : চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি ও প্রাণহানির ঘটনা বাড়তে থাকায় জেলা শহরকে ‘ডেঙ্গু রেড জোন’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে দি চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিএনসিসিআই)। একই সঙ্গে আক্রান্ত রোগীদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ঢাকা থেকে ১৫ থেকে ২০ জন ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয়ে একটি মেডিকেল টিম জরুরি ভিত্তিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের পুরাতন বাজারে চেম্বার ভবনে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব দাবি জানানো হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সিএনসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ। সভায় বক্তারা বলেন, গত প্রায় দুই বছর ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা গেলেও গত কয়েক মাসে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ঘরে ঘরে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে, পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। চেম্বারের সদস্য ওবায়দুল আজিম রিংকুসহ বেশ কয়েকজন নাগরিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলেও সভায় উল্লেখ করা হয়।
বক্তারা অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্য বিভাগের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের তুলনায় বাস্তবে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে। তাঁদের দাবি, প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী বাড়িতে কিংবা বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়ায় সরকারি হিসাবে তাঁদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। এ ছাড়া সংকটাপন্ন রোগীদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পর সেখানে মৃত্যু হলে সেই তথ্যও চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে যুক্ত হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ
সভায় পৌর এলাকার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাঁরা বলেন, পৌরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। পৌর এলাকায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেনেজসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজ চললেও যথাযথ তদারকির অভাবে খনন করা খাল-নালা ও বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। বক্তাদের অভিযোগ, এসব স্থানে জমে থাকা পানি ও ময়লা-আবর্জনা এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে আজাইপুর বিল, বেলেপুকুর, বিদিরপুর ও মহানন্দা নদীর পাড়ে বর্জ্য ফেলার কারণে মশার উপদ্রব বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, পানি নিষ্কাশন ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ১২ দফা সুপারিশ মতবিনিময় সভা থেকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১২ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে সর্বদলীয় ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠন, খনন করা খাল-নালা ও জমে থাকা বর্জ্য দ্রুত অপসারণ, ওয়ার্ডভিত্তিক নির্দিষ্ট স্থানে ডাস্টবিন স্থাপন এবং ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান ও সক্ষমতা বৃদ্ধি।
এ ছাড়া বাজার, মার্কেট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ পরিষ্কার রাখা, ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র ও ডাবের খোসায় জমে থাকা পানি অপসারণ, পানি সংরক্ষণের পাত্র ঢেকে রাখা এবং নিয়মিত পরিষ্কার করার সুপারিশ করা হয়। ডেঙ্গুর প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য এড়িয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুসরণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পাশাপাশি জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌর কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সমাজ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করে সম্মিলিতভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়। সভা থেকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। একই সঙ্গে জেলার সর্বস্তরের মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান বক্তারা।


