ধূমকেতু প্রতিবেদক, সিরাজগঞ্জ : কিছু বন্ধুত্ব সময়ের সীমানা অতিক্রম করে স্মৃতির গভীরে স্থায়ী আসন গড়ে নেয়। শৈশবের দুরন্ত দিন থেকে জীবনের পরিণত অধ্যায় পর্যন্ত সেই বন্ধুত্বের বন্ধন অটুট থাকে, হয়ে ওঠে গর্ব, ভালোবাসা ও আত্মিক তৃপ্তির উৎস। আমার পরমপ্রিয় বাল্যবন্ধু ড. শহীদুল জাহীদ তেমনই একজন মানুষ, যার মেধা, মনন, গবেষণা ও সাহিত্যসাধনার বহুমাত্রিক সাফল্য আমাকে প্রতিনিয়ত গর্বিত করে।
বর্তমানে ড. শহীদুল জাহীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যুরো অব বিজনেস রিসার্চের চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের একজন স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত জীবনে তাঁর এই অর্জন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে আমার কাছে তাঁর পরিচয় আরও গভীর, আরও আত্মিক। তিনি আমার সেই বাল্যবন্ধু, যাঁর চিন্তাশীলতা ও মননশীলতার স্বতন্ত্র পরিচয় শৈশবেই আমাদের নজর কেড়েছিল।
আমাদের শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলো থেকেই শহীদুল ছিল আর দশজনের চেয়ে কিছুটা আলাদা। তার মধ্যে ছিল গভীরভাবে ভাবার প্রবণতা, জানার অদম্য আগ্রহ এবং নিজের ভাবনাকে শব্দে প্রকাশ করার এক সহজাত ক্ষমতা। মাধ্যমিক পর্যায়ে অধ্যয়নকালে তার লেখালেখির হাতেখড়ি। এরপর স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় বিতর্ক প্রতিযোগিতা, রচনা লিখন এবং কবিতা আবৃত্তির মঞ্চে সে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে সাবলীলভাবে। ছাত্রজীবন থেকেই দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রপত্রিকায় সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতির জটিল বিষয় নিয়ে তার বিশ্লেষণধর্মী কলাম পাঠকদের ভাবনার জগতে আলোড়ন তুলেছে।
অর্থনীতির মতো বিশ্লেষণনির্ভর ও পরিশ্রমসাধ্য বিষয়ে গভীর গবেষণায় নিমগ্ন থেকেও সাহিত্য থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি শহীদুল। বরং জ্ঞানচর্চার কঠোর অনুশীলনের পাশাপাশি তার ভেতরের সাহিত্যিক সত্তা ক্রমাগত সমৃদ্ধ হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে একজন গবেষক হিসেবে সে অর্জন করেছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। দেশ-বিদেশের মানসম্পন্ন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে তার তিন ডজনেরও বেশি গবেষণাপত্র। এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং স্কলার ও আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সে আন্তর্জাতিক জ্ঞানচর্চার পরিসরেও নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করে চলেছে।
কিন্তু শহীদুলকে কেবল একজন অর্থনীতিবিদ, গবেষক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দেখলে তার সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যাবে না। তার অন্তর্জগতে রয়েছে এক সংবেদনশীল কবিসত্তা, যে জীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও উপলব্ধিকে শব্দের শৈল্পিক বিন্যাসে ধারণ করতে চায়। তার কাব্যগ্রন্থ ‘চলো নক্ষত্রে হেঁটে আসি’, ‘যে সূর্য স্পর্শে ধরণি শীতল’ এবং ‘পদ্ম ফোঁটা জল’ সেই সৃজনশীল সত্তারই পরিচায়ক। এসব গ্রন্থে তার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের আড়ালে থাকা এক কোমল, অনুভূতিপ্রবণ ও নান্দনিক হৃদয়ের সন্ধান মেলে।
সম্প্রতি বাল্যবন্ধু শহীদুলের লেখা দুটি বহুল আলোচিত গ্রন্থ—‘মনকুমারী’ ও ‘অর্থনীতির বহুবচন’—আমার হাতে তুলে দেওয়ার মুহূর্তটি আমার কাছে ছিল বিশেষ আবেগের। দুটি বই যেন তার ব্যক্তিত্বের দুই ভিন্ন অথচ পরিপূরক জগতের প্রতিনিধিত্ব করে। একদিকে অনুভব, কল্পনা ও সাহিত্যিক সৌন্দর্যের অন্বেষণ; অন্যদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বিশ্লেষণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান। একই মানুষের মধ্যে এই দুই ধারার এমন সার্থক সহাবস্থান সত্যিই মুগ্ধকর।
বন্ধুর হাতে লেখা বই গ্রহণের আনন্দ কেবল একটি বই পাওয়ার আনন্দ নয়; এর সঙ্গে মিশে থাকে দীর্ঘদিনের স্মৃতি, একসঙ্গে বেড়ে ওঠার ইতিহাস এবং প্রিয় মানুষের সাফল্যকে নিজের আনন্দের অংশ করে নেওয়ার অনির্বচনীয় অনুভূতি। শহীদুলের এই অর্জন আমাকে সেই অনুভূতির মুখোমুখি করেছে বারবার। শৈশবে যে বন্ধুকে চিন্তা ও সৃজনশীলতার পথে এগিয়ে যেতে দেখেছি, আজ তার সাফল্যের বিস্তৃত পরিসর দেখে মনে হয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিভা যেমন বিকশিত হয়েছে, তেমনি সমৃদ্ধ হয়েছে তার জ্ঞান ও সৃষ্টির জগৎ।
আমার বিশ্বাস, একজন মানুষের প্রকৃত সাফল্য কেবল তার পদ-পদবি, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি কিংবা পেশাগত অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার চিন্তার গভীরতা, জ্ঞানচর্চার ব্যাপ্তি, সৃজনশীলতার ঔজ্জ্বল্য এবং মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ রেখে যাওয়ার ক্ষমতাও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। ড. শহীদুল জাহীদকে আমার কাছে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে এই বহুমাত্রিকতার সমন্বয়।
বাল্যবন্ধুর এই অগ্রযাত্রায় আমি আনন্দিত, গর্বিত ও পরিতৃপ্ত। ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের গণ্ডি পেরিয়ে তার গবেষণা, জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যসাধনা আরও বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছাক, নতুন প্রজন্মকে চিন্তা ও সৃজনশীলতার পথে অনুপ্রাণিত করুক, এটাই আমার প্রত্যাশা।
শৈশবের সেই প্রিয় বন্ধুর জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা। তার প্রজ্ঞার দীপ্তি, গবেষণার ব্যাপ্তি এবং কবিতার সুরভি আগামী দিনগুলোতেও আমাদের আলোকিত করুক। বন্ধুত্বের এই অমলিন বন্ধন অটুট থাকুক, আর তার সৃষ্টিশীল যাত্রা হয়ে উঠুক আরও সমৃদ্ধ, আরও দীর্ঘ ও আরও আলোকময়।



