ধূমকেতু প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়ায় বাড়ছে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব। উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে গবাদিপশু, সংক্রমিত হচ্ছেন মানুষও। জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা দৌলতপুরে গেল দুই মাসে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ৫৪ রোগী শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ, রোগটি নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকতে হবে। শরীরে অস্বাভাবিক ফোসকা, গুটি বা ক্ষত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
কুষ্টিয়ায় অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ শুরু হয় ২০১০ সাল থেকে। মাঝে কিছুটা কমলেও সম্প্রতি আবারও বেড়েছে এর বিস্তার। কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তবর্তী দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে অ্যানথ্রাক্স। একদিনের জ্বরেই অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে গরু-ছাগল। আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষও। দিন দিন এ রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। যাদের অধিকাংশ অসুস্থ ও রোগাক্রান্ত গরু ও ছাগলের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হচ্ছেন।
পূর্বে উপজেলার সীমান্ত লাগোয়া কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকাকে অ্যানথ্রাক্সের ‘রেড জোন’ বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে বর্তমানে রোগটির বিস্তার কেবল ওই এলাকাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেও আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে আসছেন। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই এই উপসর্গ নিয়ে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাজার ও গ্রামগুলোতে অসুস্থ পশু জবাই ও মাংস বিক্রির প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তাই হাট-বাজারে পশু বিক্রি ও জবাই প্রক্রিয়ায় সরকারি নজরদারি জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
দৌলতপুর উপজেলার হোসেনাবাদ মাঠপাড়া এলাকার নাজমুল ইসলামের ১৮ মাস বয়সী শিশু নুসাইবাও অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত। তার শরীরের বিভিন্ন অংশে ফোসকা পড়ে ঝরছে কষানি। ব্যথা নিয়ে দিন-রাত কাটছে শিশুটির। সন্তানের এমন অবস্থায় দিশেহারা বাবা-মা। চিকিৎসকের কাছে ছুটেও নেই উন্নতি।
শিশু নুসাইবার বাবা নাজমুল ইসলাম বলেন, এলাকায় গরু কাটা হলে সেই মাংস কিনে নিয়ে আসি। রান্না করে আমি ও আমার স্ত্রী সেটি খাই। আমার মেয়ে ছোট ছোট কয়েকটি টুকরা মাংস খায়। তার দুই দিন পর থেকে মেয়ের গায়ে ছোট ফোঁড়া হয়। সেই ফোঁড়া আস্তে আস্তে বড় হয়ে ফেটে যায়। বাচ্চা ঠিকমতো ঘুমায় না। তার গায়ে ব্যথা করে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে পরে শুনছি এটা অ্যানথ্রাক্স রোগ। এখন ওষুধ খেয়ে কালো হয়ে আছে জায়গাগুলোতে। চিকিৎসা নিলেও এখনও শরীরে ফোঁড়ার মতো বের হচ্ছে। সন্তানকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।
দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের গাছেরদিয়াড় গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম। বাড়ির পাশের একটি গরু অসুস্থ হয়ে পড়লে সেটি জবাই করা হয়। কাটাকাটির কাজে অংশ নেন কৃষক রফিকুল ইসলাম। তখনো তিনি বুঝতে পারেননি, কী কারণে পশুটি অসুস্থ হয়েছে।
রফিকুল ইসলাম বলেন, মাংস কাটার ২-৩ দিন পর তার হাত ও আঙুলে ছোট ছোট ফোস্কার মতো দেখা দেয়। সেই সঙ্গে দেখা দেয় তীব্র জ্বর ও শরীরব্যথা। কয়েক দিনের মধ্যে ফোস্কা বড় ক্ষতে পরিণত হয় এবং ক্ষতের মাঝখান কালো হতে শুরু করে। প্রথমে চর্মরোগ মনে করলেও ক্ষত দ্রুত বাড়তে থাকায় দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন রফিকুল। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, তিনি অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। এখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি।
একই এলাকার ইউসুব সরদার তার নিকটাত্মীয়ের রোগাক্রান্ত গরু জবাইয়ের দুই দিন পর পড়েন বিপাকে। তার শরীরেও বাসা বাঁধে অ্যানথ্রাক্স রোগ। শরীরের বিভিন্ন অংশে পড়ে ফোসকা। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে দিন-রাত কাতরাচ্ছেন। তবে বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, সারা বছরই অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে গেল দুই মাস, বিশেষ করে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে দৌলতপুর উপজেলায় ৫৪ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। জেলার বিভিন্ন এলাকাতেও অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগী রয়েছেন।
দৌলতপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. নাজমুস সাকিব জানান, অ্যানথ্রাক্স মূলত গবাদিপশুর একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত মারাত্মক রোগ, যা আক্রান্ত পশু থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। রোগটির বিস্তার ঠেকাতে প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে গবাদিপশুকে টিকা দেওয়া ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অসুস্থ পশু গোপনে জবাই ও বিক্রি করার প্রবণতা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আক্রান্তদের বড় একটি অংশ অসুস্থ গবাদিপশু জবাই, কাঁচা মাংস কাটাকাটি কিংবা প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত রোগী আমরা এখন বেশি পাচ্ছি। আগস্ট মাসে পেয়েছি আমরা ৩০ জন, সেপ্টেম্বর মাসে পেয়েছি আমরা ২৪ জন। এই দুই মাসে আমরা ৫৪ জন অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগী পেয়েছি। আমাদের দৌলতপুর এলাকাটা অনেক বড়। ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে এই দৌলতপুর। প্রায় প্রত্যেকটি ইউনিয়নেই এই রোগে আক্রান্ত রোগী আছে। এই রোগ গবাদিপশুর মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে যায়। অনেকে আছেন, গবাদিপশু অসুস্থ হয়ে গেলে জবাই করে দেন। আর এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা যুক্ত থাকেন, তাদের শরীরেই এই রোগ বাসা বাঁধছে। এখন উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন।
তিনি আরও বলেন, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো অসুস্থ পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা। কোনো পশুর শরীরে অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অন্যদিকে মানুষের শরীরে কোনো অস্বাভাবিক গুটি, ফোসকা বা কাঁচা ঘায়ে কালো ক্ষত দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংক্রামক এই রোগ নিয়ন্ত্রণে অসুস্থ পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাস বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পশু অসুস্থ হয়ে পড়লে আর্থিক ক্ষতির ভয়ে মালিকেরা সেটি দ্রুত কম দামে বিক্রি কিংবা জবাই করে ফেলেন। আর অসচেতনতার কারণে ওই পশুর কাঁচা মাংস কাটাকাটি ও ধোয়ামোছা করতে গিয়ে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্ত পশু মারা গেলে তা খোলা জায়গায় না ফেলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ উপায়ে গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হবে। তিনি আরও বলেন, কেউ যাতে অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য সচেতনতার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কুষ্টিয়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আল-মামুন হোসেন মণ্ডল বলেন, দৌলতপুর হচ্ছে অ্যানথ্রাক্সপ্রবণ এলাকা। সেখানে আমরা নিয়মিত ভ্যাকসিন গবাদিপশুদের দিই। গত বছর প্রায় ৪০ হাজার ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। এ বছরও প্রায় ৪০ হাজারের বেশি ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে এবং এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ এখনো চলমান। তিনি বলেন, গবাদিপশু অসুস্থ হলেই সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সঠিকভাবে চিকিৎসা দিতে হবে। এ ছাড়া পশু অসুস্থ হয়ে গেলেই জবাই করে বিক্রি করার মানসিকতা আমাদের বন্ধ করতে হবে।
কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, গত দুই মাসে ৫৪ জন অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সতর্কতা হচ্ছে, যারা আক্রান্ত হয়ে গেছেন, তারা যেন অবশ্যই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নেন। হাসপাতালে একজন ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া আছে, তিনি অ্যানথ্রাক্স রোগের চিকিৎসা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, অসুস্থ গবাদিপশু কোনোভাবেই যেন জবাই করে বিক্রি করা না হয় এবং কেউ যদি বিক্রি করে, সেখান থেকে যেন কেনা না হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করে যেন আইনের আশ্রয় নেওয়া হয়। অ্যানথ্রাক্স নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা। অসুস্থ বা মৃত গবাদিপশুর মাংস না খাওয়া এবং আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।



