ধূমকেতু প্রতিবেদক,বদলগাছী : নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কোলা ইউনিয়নের পূর্ব বনগ্রামের হাস্তা বিলে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা আবাসন প্রকল্পটি এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। ২০১২ সালে পুনর্বাসিত ২৭০টি ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে বর্তমান ১৮৫ টি ঘরই ফাঁকা পড়ে রয়েছে। দীর্ঘ ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও চলে যাওয়া পরিবারগুলো আর এই আবাসনে ফিরে আসেনি। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, তীব্র কর্মসংস্থান সংকট এবং বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশের কারণে বর্তমানে মাত্র ৮০ থেকে ৮৫ টি পরিবার এখানে কোনোমতে দিনাতিপাত করছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার উদ্যোগ না নিলে আগামী ২-১ বছরের মধ্যে পুরো আবাসন প্রকল্পটি সম্পূর্ণ জনশূন্য হয়ে পড়বে।
সরেজমিনে আবাসন প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, এখানকার টিনের ব্যারাকগুলোর সিংহভাগই জং ও মরিচা ধরে ভেঙে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বর্তমানে যে পরিবারগুলো বসবাস করছে, তাদের ঘরের চাল ও বেড়ার টিন ফুটো হয়ে গেছে।
ব্যারাকে বসবাসরত রফিকুল ইসলাম তাঁর ঘরের চালের ফুটো দেখিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, পরিবার নিয়ে ঘরের ভেতরে খুব কষ্টে দিন-রাত পার করছি। বৃষ্টি হলেই ওপর থেকে পানি পড়ে, আর রোদের দিনে টিনের তাপে ঘরের ভেতর থাকা যায় না। এই আবাসন প্রকল্পে মোট ৫৪ টি ব্যারাক রয়েছে, যার প্রতিটিতে ৫টি করে পরিবারের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। সংস্কারের কোনো উদ্যোগ না থাকায় এই বিপুল সরকারি সম্পত্তি এখন নষ্ট হওয়ার মুখে।
পুনর্বাসনের শুরুতে সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি বলে অভিযোগ অধিবাসীদের।
ধুধু মাঠের মাঝখানে এই আবাসন হওয়ায় আশেপাশে কাজের কোনো সুযোগ নেই।
আবাসনের বাসিন্দা সিদ্দিক, খুদু, হামিদ ও লুৎফা বেগম জানান, আশেপাশে কোনো গ্রাম বা কর্মসংস্থান নেই যে মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করব। খেয়ে না খেয়ে আমাদের দিন কাটছে।
আবাসন প্রকল্পের সভাপতি আব্দুল জব্বার জানান, এখানে শিশুদের পড়াশোনার জন্য কোনো বিদ্যালয় নেই। প্রায় ৫ বছর আগে এখানকার বাসিন্দারা নিজেদের চাঁদায় একটি টিনের মসজিদ ঘর তুললেও বর্তমানে সেটিরও জরাজীর্ণ অবস্থা, এছাড়াও রয়েছে তীব্র নিরাপত্তা হীনতা। রাতের বেলা জানালা খুলে ঘুমানো যায় না; অন্ধকারে দুর্বৃত্ত ও নেশাখোরেরা এসে জানালায় ধাক্কাধাক্কি করে। যাদের গ্রামে সামান্য মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে, তারা এখানে এক-দুই রাত থেকেই ঘরে তালা ঝুলিয়ে রেখে চলে গেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে ঐতিহ্যবাহী ‘হাস্তা বিল’ বা জলাশয়ে এই আবাসন প্রকল্পটি গড়ে তোলা হয়েছিল। জলাশয়ে বসবাসের উপযোগী না হওয়ায়, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর তৎকালীন জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে হাস্তা বিলসহ উপজেলার কয়েকটি বিলের শ্রেণী পরিবর্তন করে ‘ভিটা জমিতে’ রূপান্তর করা হয়, যা পরিবেশ ও বাস্তবতার দিক থেকে ছিল অপরিকল্পিত।
অতীতে আবাসন প্রকল্পের বিভিন্ন সংকটে দৈনিক সংবাদ এ প্রতিবেদন প্রকাশ করায় প্রশাসনের টনক নড়িয়েছে-
আগে আবাসন প্রকল্পের ২টি পুকুর ইউএনও অফিস থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অবৈধভাবে লিজ দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে সংবাদ প্রকাশের পর তা পুনর্বাসিতদের দখলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে আবাসনের রাস্তার কাদার ওপর সংবাদ প্রকাশের জেরে ২০২৫ সালে প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের মাধ্যমে ইটের রাস্তা নির্মাণ করা হয়।
এ বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি সরে জমিনে আবাসন প্রকল্পটি পরিদর্শন করবো। এবং ব্যারাকগুলো সংস্কারের জন্য ইউএনও স্যারের সাথে কথা বলে একটি এস্টিমেট তৈরি করে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে পাঠাবো।
আবাসন প্রকল্পে ব্যারাকগুলো সংস্কারের অভাবে জং-মরিচায় ধ্বংস হচ্ছে বলে প্রশ্ন করলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি বলেন, এই আবাসন প্রকল্পটি অনেক আগে নির্মিত। আর এইসব সংস্কারের জন্য সরকার কোন বরাদ্দ দেয়নি, দিলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাহলে কি সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় নির্মিত প্রকল্প গুলো কি সংস্কারের অভাবে এইভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে বলে অপর প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠাবো।বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ও সচেতন মহলের দাবি, আবাসন প্রকল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে দ্রুত ব্যারাকগুলো সংস্কার করা এবং বাসিন্দাদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি।



