ধূমকেতু প্রতিবেদক,সবুজ সরকার, নিয়ামতপুর : ধানের রাজ্য হিসেবে খ্যাত নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলা। এই উপজেলার মাকলাহাট গ্রামের কৃষক জহির রায়হান (৩০)। যিনি এলাকায় শামীম নামেই পরিচিত। শামীম গতবছর ইউটিউবে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষের একটা ভিডিও দেখেন। ভিডিও দেখে তাঁর তরমুজ চাষে আগ্রহ জাগে। তবে এলাকার সব কৃষকের ‘ধ্যানজ্ঞান’ যেখানে ধান সেখানে অন্য ফসল চাষ করা নিয়ে শঙ্কা আর ভয়ও ছিল। তবে সব ভয়কে জয় করে হয়েছেন সফল। তাঁর মতো এলাকার মাহফুজ আলম ও ফারুক হোসেনও এই ‘অসময়ের তরমুজ চাষ করে পেয়েছেন সাফল্য।
শামীম জানান, ইউটিউবে ভিডিওটা দেখার পর থেকেই বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নেওয়া শুরু করেন। এবছর তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে মাচায় তরমুজের চাষ করেছেন। এরমধ্যে দেড় বিঘা জমি নিজের আর দুই বিঘা বর্গা নিয়েছেন। নিজের জমিতে খরচ হয়েছে ৮০ হাজার টাকা আর বর্গা জমিতে ২০ হাজার টাকা বেশি লেগেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মালচিং পদ্ধতি হলো মাটিতে পচনশীল একধরনের পলিথিন দিয়ে চাষের বেড ঢেকে দেওয়া। আর মালচিং কাগজ হলো একধরনের কাগজ, যার এক পাশে কালো ও অন্য পাশে রুপালি রং করা থাকে। কালো পাশ নিচে ও রুপালি পাশ ওপরের দিকে দিয়ে মাটি ঢেকে দিতে হয়। এভাবে মাটি ঢেকে দেওয়ার ফলে কালো রঙের প্রভাবে প্রচণ্ড সূর্যের তাপেও মাটির আর্দ্রতা শুকিয়ে যায় না। এ কারণে মাটিতে পানির পরিমাণ কম লাগে। অন্যদিকে মাটি ঢেকে থাকায় আগাছা হয় না। রুপালি পাশ ওপরে থাকায় পোকামাকড়ের উপদ্রবও তুলনামূলক কম হয়।
শামীম বলেন, বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ খবর নিয়ে এগ্রিওয়ান কোম্পানির বগুড়া অফিস থেকে স্মার্টবয় জাতের তরমুজের বীজ সংগ্রহ করেন। মালচিং ও মাচা তৈরি করে চলতি বছরের জৈষ্ঠ্য মাসে জমিতে বীজ বপন করেন। বীজ রোপণের ৬২ দিন পরে তরমুজ বিক্রি উপযোগী হয়ে যায়।
বেশিরভাগ তরমুজ তিন থেকে সাড়ে তিন কেজি ওজনের হয়েছে। সর্বোচ্চ ছয় কেজি ওজনের আর সর্বনিম্ন এক কেজি ওজনের হয়েছে।
বিঘা প্রতি ফলন হয়েছে ১০০ মণের উপরে। এখন পর্যন্ত তিনি দেড় বিঘার জমির তরমুজ বিক্রি করেছেন। প্রতিমণ এক হাজার ৮০০ টাকা। তবে ছোট সাইজের তরমুজের দাম কম পেয়েছেন।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও দিনাজপুরের ব্যবসায়ীরা তাঁর কাছ থেকে তরমুজ কিনে নিয়ে গেছেন বলে জানালেন।
তিনি জানান, একই জমিতে প্রতিবছর এই তরমুজ চাষ করা যাবে না। এক বছর বাদ দিয়ে চাষ করতে হবে। তাহলে ফলন ভালো হবে। প্রতিবছর একই জমিতে চাষ করলে আর্থিকভাবে লাভবান নাও হতে পারেন।
তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই তরমুজ চাষে সময় কম লাগে। তাই সময়মত সার প্রয়োগ করতে হয়। না হলে ফলন ভালো হয় না।’ ঠিকমতো সার না পাওয়াতে পরবর্তী ধাপের তরমুজ চাষ নিয়ে তিনি কিছুটা হতাশায় রয়েছেন।
একই এলাকার আরেক তরমুজ চাষী মাহফুজ আলম (৩০) বলেন, তিনি বর্গা নিয়ে আড়াই বিঘা জমিতে এই গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ করেছেন। ফলন ভালোই হয়েছে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে তরমুজ বাজারজাত করতে পারবেন।
জমি বর্গা নিয়ে তাঁর বিঘাপ্রতি এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। নিজের জমি হলে খরচ কম হতো। আর দুই লাখ টাকার মত তরমুজ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, ধান চাষে সময় লাগে চার মাস। আর এই তরমুজ দুই মাসেই চাষ করা যায়। ধানের চাইতে লাভও বেশি। তাছাড়া পরিমিত বৃষ্টি হলে জমিতে কোনো সেচ দেওয়াও লাগে না। সার, কীটনাশক লাগে পরিমিত পরিমাণে।
গ্রীস্মকালীন তরমুজ চাষে আগ্রহীদের জ্ঞাতার্থে মাহফুজ আলম বলেন, হুটহাট করে এই তরমুজ চাষ শুরু করা যাবে না। আগে ভালোভাবে চাষ সম্পর্কে জেনে তারপর এই তরমুজ চাষ শুরু করতে হবে। তা না হলে ফলন ভালো হবে না। আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আড়াই বিঘাা জমি বর্গা নিয়ে এই তরমুজ চাষ করেছেন একই এলাকার ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমবার এই তরমুজ চাষ করে ফলন ভালোই হয়েছে। এখন বিক্রি করতে পারিনি। অল্প কিছু দিনের মধ্যে বিক্রি করতে পারবো।’
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত রাজশাহীর কৃষক মনিরুজ্জামান বলেন, তিনিও বেশ কয়েকবার এই গ্রীষ্মকালীন তরমুজের চাষ করেছেন।
তিনি মনে করেন, ‘কৃষকেরা ফসল উৎপাদন করে দুই টাকা মুনাফার জন্য। কৃষকরা যাতে উৎপাদিত এসব তরমুজ সহজেই ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করতে পারে সেজন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে একটা ব্যবস্থা থাকা দরকার। তাহলে কৃষকেরা এসব ফসল চাষে আগ্রহী হবেন।’
নিয়ামতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নিয়ামতপুরে সাধারণত ধানের চাষই বেশি হয়। প্রথাগত চাষের বাহিরে গিয়ে মাকলাহাটের তিনজন তরুণ উদ্যােগী কৃষক গ্রীষ্মকালীন তরমুজের চাষ করেছেন। এই তরমুজ ৬০-৭০ দিনের মধ্যে বাজারজাত করা যায়। অন্যান্য ফসলের তুলনায় লাভ ভালো। নিয়ামতপুরে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষে যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এটি যেমনে রসাল, তেমনি সুমিষ্ট। কৃষকদের এ তরমুজ চাষে উদ্বুদ্ধ করতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পরামর্শ, সহযোগিতা ও প্রয়োজনে প্রণোদনা প্রদান করা হবে।’



