ধূমকেতু নিউজ ডেস্ক : ঘনিষ্ঠ দুই বন্ধু। ছোটবেলা থেকেই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ। দেখতে একই রকম, হাসিও প্রায় এক। মজা করে একে অপরকে ডাকতেন ‘বোন’। কিন্তু তখনও তারা জানতেন না, সেই ডাকের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সত্যি।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত দুই নারী মীনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টিজেনের গল্প যেন বলিউডের কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য। কয়েক দশক ধরে তারা ছিলেন বন্ধু। পরে ডিএনএ পরীক্ষায় জানা গেল, তারা আসলে একই বাবা-মায়ের সন্তান।
১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে ভারতের মুম্বাইয়ে জন্ম হয় মীনা ও মিনালের। জন্মের কয়েক মাসের মধ্যে তাদের আলাদা দুটি অনাথ আশ্রম থেকে দত্তক নেয় নেদারল্যান্ডসের দুটি পরিবার। দুই পরিবার কাছাকাছি এলাকায় বসবাস করায় বড় হতে হতে তাদের পথও একসময় মিলিত হয়।
প্রথম দেখাতেই বিস্ময়
কৈশোরে একটি দত্তক গ্রহণকারী সংস্থার অনুষ্ঠানে প্রথম দেখা হয় মীনা ও মিনালের। সেখানে অন্য দত্তক নেওয়া শিশুদের সঙ্গে তাদেরও পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
প্রথম দেখাতেই দুজনের বন্ধুদের চোখে পড়ে তাদের অদ্ভুত মিল। মুখের গড়ন, নাক, হাসি—সবকিছুতেই যেন একে অপরের ছায়া।
মীনা বলেন, বন্ধুরা তাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলেছিল, নিজেদের দিকে তাকাও।
মীনার চোখে তখনই পড়ে মিনালের নাক তার নিজের মতো। এমনকি তাদের হাসির ধরনও একই রকম ছিল। প্রথম দেখাতেই দুজনের মধ্যে তৈরি হয় গভীর এক টান।
পরদিন তারা নিজেদের ফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করেন। এরপর শুরু হয় চিঠি লেখা ও নিয়মিত যোগাযোগ। একসময় মজা করেই একে অপরকে ‘সিস’ বা বোন বলে ডাকতে শুরু করেন। কারণ তাদের মনে হয়েছিল, সম্পর্কটা যেন বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি কিছু।
একই পছন্দ, একই রকম অভ্যাস
বছরের পর বছর চিঠির মাধ্যমে তারা নিজেদের জীবনের নানা কথা ভাগ করে নিতেন। স্কুল, বন্ধু, প্রেম, ঘুরতে যাওয়া, নাচ, খেলাধুলা—সবই ছিল তাদের আলোচনায়।
দুজনের পছন্দেও ছিল আশ্চর্য মিল। বিশেষ করে সংগীতের ক্ষেত্রে দুজনেই জনপ্রিয় ব্যান্ড ব্যাকস্ট্রিট বয়েজের ভক্ত ছিলেন।
কিন্তু প্রায় ১৫ বছর আগে হঠাৎ তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিনাল ফ্রান্সে চলে যান। অন্যদিকে মীনা তখন প্রথম সন্তানের মা হয়েছেন। সংসার ও সন্তান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় যোগাযোগ আর নিয়মিত থাকেনি।
ডিএনএ পরীক্ষায় বদলে গেল সব
২০১৭ সালে ভারতে দত্তক নেওয়া ব্যক্তিদের একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে মীনা ডিএনএ পরীক্ষা সম্পর্কে জানতে পারেন। নিজের শিকড় সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকেই তিনি পরীক্ষা করান। কিন্তু কোনো মিল খুঁজে পাননি।
এরপর চলতি বছরের শুরুতে ফোনের জায়গা খালি করতে গিয়ে তিনি ডিএনএ পরীক্ষার অ্যাপটি মুছে ফেলেন।
তারপর ২০ মে আসে সেই অবিশ্বাস্য বার্তা।
ফেসবুকে মীনার কাছে মেসেজ পাঠান মিনাল। সেখানে লেখা ছিল—আমাকে মনে আছে?
মিনাল এর কিছুদিন আগে, এপ্রিল মাসে, নেদারল্যান্ডসে নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিলেন। পরীক্ষার ফলাফলের একটি ছবি তিনি মীনার কাছে পাঠান।
মীনা আবার অ্যাপটি ইনস্টল করেন। উত্তেজনা ও উদ্বেগে ভুল পাসওয়ার্ডও কয়েকবার দেন। অবশেষে যখন ফলাফল দেখলেন, তখন আর কোনো সন্দেহ রইল না।
ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, দুজনের মধ্যে ১০০ শতাংশ মিল।
অর্থাৎ তারা শুধু বন্ধু নন—তারা একই বাবা ও মায়ের সন্তান।
মীনা বলেন, ফলাফল দেখে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। এতদিন যে মানুষটিকে তিনি বোনের মতো মনে করতেন, তিনিই যে সত্যিকারের বোন—ডিএনএ পরীক্ষা সেটিই নিশ্চিত করল।
‘আমরা বোনই ছিলাম, শুধু জানতাম না’
মিনালও প্রথমে ডিএনএ পরীক্ষার ফল দেখে বুঝতে পারেননি, তার পাওয়া ‘ফুল সিস্টার’ আসলে সেই কিশোরী মীনা, যার সঙ্গে তিন দশক আগে পরিচয় হয়েছিল।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মীনার ছবি দেখে বিষয়টি তার কাছে পরিষ্কার হয়।
মিনাল বলেন, তারা আগে বন্ধু ছিলেন, পরে জানতে পেরেছেন তারা বোন। আসলে তারা পুরো সময়ই বোন ছিলেন—শুধু কেউ তা জানতেন না।
বহু বছর পর ‘ঘরে ফেরার’ অনুভূতি
ডিএনএ পরীক্ষার সত্য জানার পর গত আগস্টে প্রথমবারের মতো আবার মুখোমুখি হন দুই বোন। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর সেই সাক্ষাৎ ছিল আবেগে ভরা। কান্না, আলিঙ্গন আর হাসিতে কেটে যায় পুনর্মিলনের মুহূর্ত।
মীনা বলেন, তার কাছে সেই সাক্ষাৎ ছিল ঘরে ফেরার মতো।
বর্তমানে মীনা তিন সন্তানের মা। মিনাল ফ্রান্সে সঙ্গী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন। এরই মধ্যে তারা একে অপরের স্বামী বা সঙ্গী, সন্তান, ভাই ও বাবা-মায়ের সঙ্গেও পরিচিত হয়েছেন।
মীনা বলেন, তাদের কথা বলার ধরন, হাঁটা, মাথা নাড়ার ভঙ্গি—সবকিছুতেই এখনো আশ্চর্য মিল খুঁজে পান পরিবারের সদস্যরা। কখনো তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেন এবং সময়ের হিসাবই থাকে না।
এবার একসঙ্গে মুম্বাই ফেরার ইচ্ছে
তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোসও এখন স্পষ্ট। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে তারা একে অপরের পাশে থাকতে পারেননি।
এখন সেই অপূর্ণতা কিছুটা পূরণ করতে চান তারা। মীনা ও মিনালের ইচ্ছে, একদিন একসঙ্গে ভারতে ফিরে আসবেন। ঘুরবেন মুম্বাইয়ের সেই রাস্তায়, যেখান থেকে তাদের জীবনের গল্প শুরু হয়েছিল।
দশকের পর দশক অজান্তেই পাশাপাশি চলেছে দুই বোনের জীবন। বন্ধুত্বের মধ্যেই তারা খুঁজে পেয়েছিলেন বোনের সম্পর্ক। আর একটি ডিএনএ পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করে দিল সেই সত্য—তারা বোন ছিলেন শুরু থেকেই, শুধু জানতেন না।
সূত্র: বিবিসি



