ধূমকেতু প্রতিবেদক,বদলগাছী : হাসপাতালে আসা অসুস্থ রোগীদের পরম যত্নে সেবা দেওয়ার কথা যাদের, তাদের বিরুদ্ধেই এবার হাসপাতালের ভেতরেই সহকর্মীকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নাইট ডিউটি (রাতের দায়িত্ব) রোস্টার নিয়ে বিরোধের জেরে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক সিনিয়র স্টাফ নার্সকে জরুরি বিভাগের সামনে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে। ঘটনার তিন দিন পার হলেও ভুক্তভোগী নার্স এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় বইছে।
গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশে প্রকাশ্য দিবালোকে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে।
হাসপাতাল ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসের শুরুতে রাতের ডিউটির রোস্টার সাজানো নিয়ে সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহানাজ পারভিনের সঙ্গে অপর নার্স শিল্পী আক্তারের বাগবিতণ্ডা হয়। এর জেরে ঘটনার দিন শিল্পী আক্তারের বোন লিপি আক্তার (যিনি নিজেও একই হাসপাতালের নার্স) বাসা থেকে হাসপাতালে আসেন। অভিযোগ উঠেছে, কর্তব্যরত অবস্থায় শাহানাজ পারভিনকে দুই বোন মিলে আচমকা আক্রমণ ও মারধর শুরু করেন। শাহানাজের চিৎকার শুনে সহকর্মীরা ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
ভুক্তভোগী নার্স শাহানাজ পারভিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ডিউটি নিয়ে সামান্য কথাকাটাকাটি হতেই পারে। কিন্তু লিপি বাসা থেকে এসে বোনের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমাকে এভাবে মারবে, তা ভাবতেও পারিনি। আমার চোখ ও মুখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত করা হয়েছে। আমি এই অন্যায়ের সুষ্ঠু বিচার চাই।”
এদিকে মারধরের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত দুই বোন শিল্পী ও লিপি আক্তার পাল্টা দাবি করে তারা বলেন, শাহানাজ প্রায়ই আমাদের কটাক্ষ ও গালাগাল করতেন। ঘটনার দিন এর কারণ জানতে চাইলে শাহানাজই প্রথমে আমাদের ওপর চড়াও হন। একই সঙ্গে তারা শাহানাজের বিরুদ্ধে এক ভরি ওজনের দুটি সোনার বালা এবং আট আনার একটি সোনার চেইন ছিনতাইয়ের পাল্টা অভিযোগ এনে থানায় ডায়েরি করেছেন বলে জানান।
ঘটনার সময় দায়িত্বরত নার্স শিরিন আক্তার জানান, মারামারির সময় তিনি সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও পরে বিষয়টি জেনেছেন। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় হাসপাতালের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী চরম বিব্রত এবং তারা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
বদলগাছী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাবিবুর রহমান জানান, এ ঘটনায় দুই পক্ষই থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কানিস ফারহানা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “এই অপ্রীতিকর ঘটনায় হাসপাতালের সুনাম চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আসাদুজ্জামান নাহিদকে প্রধান করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।”
তদন্ত কমিটির প্রধান ডা. আসাদুজ্জামান নাহিদ জানান, তদন্তের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে।
সরকারি হাসপাতালের অভ্যন্তরে দায়িত্ব পালনকালে সহকর্মীদের এমন সহিংস আচরণে হাসপাতালের সার্বিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয় সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছেন তদন্ত কমিটির রিপোর্টের দিকে আসলেই কি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হবে, নাকি আড়ালেই থেকে যাবে দোষীরা?


