ধূমকেতু প্রতিবেদক : বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে পাখির নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণ, জলাভূমি রক্ষা এবং রাজশাহীর শিমলা পার্কের বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকার মর্যাদা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে পরিবেশবাদী ও যুব সংগঠনসমূহ।
শনিবার বিকেল ৪টায় শিমলা পার্কে পথসভা থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সারাদেশে পাখিবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। এবারের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য “প্রতিটি পাখিই গুরুত্বপূর্ণ-আপনার পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ” যা পাখি সংরক্ষণে জনসম্পৃক্ততা ও তথ্যভিত্তিক উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে।
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস), বারসিক, গ্রিন কোয়ালিশন এবং সেভ ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড নেচারের উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
বক্তারা বলেন, পরিযায়ী পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, পরাগায়ন ও বীজ বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু জলাভূমি ভরাট, পুকুর ও বিল দখল, নদীদূষণ, গাছ কাটা, আবাসস্থল ধ্বংস এবং পাখি শিকারের কারণে তাদের বিচরণ ও টিকে থাকার পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে পাখি সংরক্ষণ তাই জলাভূমি, প্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, “পাখি সংরক্ষণ শুধু পাখি রক্ষার বিষয় নয়; এটি আমাদের পুকুর-নদী-জলাশয়-জলাভূমি, গাছপালা ও সামগ্রিক পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে যুক্ত। শিমলা পার্কের বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকার মর্যাদা কার্যকর করে পাখি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে হবে।”
সেভ দি নেচার এন্ড লাইফ এর চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, “বরেন্দ্র অঞ্চলের পুকুর, বিল, নদী, জলাভূমি ও বৃক্ষভিত্তিক আবাসস্থল পাখির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রাকৃতিক সম্পদ দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে হবে এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।”
সেভ ওয়াইল্ড লাইফ এন্ড নেচারের সভাপতি ইমরুল কায়েস বলেন, “পাখি পর্যবেক্ষণ, প্রজাতি শনাক্তকরণ ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তরুণেরা সংরক্ষণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাখি দেখুন, তথ্য রাখুন, আবাসস্থল বাঁচান-এই চর্চা ছড়িয়ে দিতে যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।”
গ্রিন কোয়ালিশনের সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা জুয়েল কিবরিয়া বলেন, “প্রতিটি পাখিই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশে যেভাবে পাখি শিকার পরিবেশ ধ্বংসের ঘটনা ঘটছে এগুলো অবিলম্বেই বন্ধ করতে হবে। সকলের জন্য বাসযোগ্য ও পাখিবান্ধব একটি শহর হিসেবে আমরা রাজশাহীকে চাই।”
কর্মসূচি থেকে শিমলা পার্কের সংরক্ষণ এলাকার সীমানা নির্ধারণ, ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন, নিয়মিত নজরদারি ও আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি বরেন্দ্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পুকুর, বিল, জলাভূমি, নদী ও চরকে পাখির আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত ও সংরক্ষণ; রাজশাহী নগরের জলাশয় ও সবুজ এলাকাকে নগর প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণের আওতায় আনা; পাখি শিকার, আবাসস্থল ধ্বংস ও দূষণ বন্ধ; এবং যুব, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে পাখি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
কর্মসূচী থেকে ৮ দফা নীতিগত দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো- বরেন্দ্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পুকুর, বিল, জলাভূমি, নদী, সমগ্র পদ্মাপাড় ও চরাঞ্চলকে পাখি ও পরিযায়ী পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত ও সংরক্ষণ করতে হবে; রাজশাহী নগরের পুকুর, জলাশয়, উদ্যান ও সবুজ এলাকাকে নগর প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে; শিমলা পার্কের বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকার ঘোষণাকে অবিলম্বে কার্যকর করে এর সীমানা, ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, নজরদারি ও আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে; শিমলা পার্কসহ সংরক্ষণ এলাকা দখল ও দূষণমুক্ত করতে হবে। সাউন্ড বক্সের ব্যবহার, আলোর ব্যবহার, পাখি শিকার, বন্যপ্রাণী হয়রানি, আবাসস্থল ধ্বংস, দূষণ, বর্জ্য ফেলা ও ক্ষতিকর কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পাখির আবাসস্থলের একটি “স্থানীয় প্রাণবৈচিত্র্য ও পাখি মানচিত্র” এবং যুব, শিক্ষার্থী, পাখি পর্যবেক্ষক ও স্থানীয় জনগণকে নিয়ে নাগরিক পাখি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা চালু করতে হবে; পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণকে নগর পরিকল্পনা, জলাভূমি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে; রাজশাহীর চলমান বৃক্ষ হত্যা বন্ধ করতে হবে। শহরের অবশিষ্ঠ গাছগুলোকে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ এর ১৬ ধারার বিধান অনুযায়ী বিভিন্ন পাখির আবাসস্থল হিসেবে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করতে হবে; পাখি ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণ, পরিবেশবাদী যুব ও নাগরিক সংগঠনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বক্তারা আরো বলেন, “দেশে এত আইন রয়েছে কিন্তু নেই তার প্রয়োগ। সারাদেশে সর্বত্রই পরিবেশ হত্যার ঘটনা ঘটছে কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক কোন শাস্তি হচ্ছে না। মানুষ হত্যা যদি অপরাধ হয় হত্যাকারীর বিচার হয় তাহলে এই গাছ হত্যাকারী, পুকুর হত্যাকারী, পাখি হত্যাকারী, পরিবেশ হত্যাকারীর বিচার কেন হবে না?
এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন সামাজিক কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সম্রাট রায়হান, আদিবাসী ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শিদ কুমার ওরাও, আদিবাসী যুব নেতা উপেন রবিদাস, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী ওয়ালিউর রহমান বাবু, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক পলি রানীসহ প্রমুখ।
আয়োজকদের মতে, পাখির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগ, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও যুবসমাজের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। তাঁদের আহ্বান, আমাদের শহর, আমাদের সমাজ, আমাদের দেশকে পাখিবান্ধব এবং প্রাণ-প্রকৃতি বান্ধব করে গড়ে তুলি। “বরেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ-পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করি।”



