ধূমকেতু প্রতিবেদক, সানজাদ রয়েল সাগর. বদলগাছী: ঈদের ছুটিতে নওগাঁর বদলগাছীর ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার হয়ে উঠেছে দর্শনার্থীদের মিলনমেলা। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনদের নিয়ে হাজারো মানুষ ছুটে এসেছেন এই প্রাচীন প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনটি ঘুরে দেখতে। কেউ স্মৃতির খাতায় ছবি বন্দি করছেন, কেউবা ইতিহাসে হারিয়ে যাচ্ছেন এই প্রাচীন স্থাপনার মাঝে। দর্শনার্থীদের এমন উপচে পড়া ভিড়ে মুখরিত বৌদ্ধ বিহার পাহাড়পুর। ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে হাজার হাজার দর্শনার্থী ছুটে আসছেন এই ঐতিহাসিক স্থানে।
রেকর্ড সংখ্যক দর্শনার্থী গতবারের তুলনায় এবছর ঈদুল ফিতরে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিলো চোখে পড়ার মতো। ঈদের তিন দিন- শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত এই পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমিয়েছেন। সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ ছুটি থাকায় অনেকেই পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে এই ঐতিহাসিক স্থানে এসেছেন।
গত তিন দিনে টিকিট বিক্রির টাকার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ লাখ টাকা।
শনিবার (২১ মার্চ) ঈদের দিন : ১৩,৬৫৫ জন দর্শনার্থী, টিকিট বিক্রি ৪ লাখ ২২ হাজার ৫১০ টাকা। রবিবার (২২মার্চ) ঈদের ২য় দিন : ১৬,৬০৫ জন দর্শনার্থী, টিকিট বিক্রি ৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬০ টাকা। সোমবার (২৩ মার্চ) ঈদের ৩য় দিন : ১৩,৬৭৫ জন দর্শনার্থী, টিকিট বিক্রি ৪ লাখ ২৩ হাজার ৭০০ টাকা।
নিরাপত্তা ও যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দ্য
ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত হলেও এটি জয়পুরহাট জেলা শহরের কাছাকাছি। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার জামালগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে পাহাড়পুর মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে। তাই বিভিন্ন স্থানের লোকজন রেলপথে জয়পুরহাট এসে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে আসছেন।
দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিহার চত্বরে মোতায়েন ছিল ট্যুরিস্ট পুলিশ ও আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। যানজট নিয়ন্ত্রণে ছিল ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতা। ফলে এবছর যাতায়াতে কোনো বিড়ম্বনা হয়নি, দর্শনার্থীরা ছিলেন স্বস্তিতে।
পাহাড়পুরের সৌন্দর্য ও সুব্যবস্থা ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বার, প্রতœসামগ্রী ও বই সম্বলিত কক্ষ, পুরুষ-মহিলাদের জন্য আলাদা টয়লেট, একটি মসজিদ, অফিসার ও স্টাফ কোয়ার্টার এবং আনসার সদস্যদের আবাসন। বিশ্রামের জন্য রয়েছে ১০টি ছাউনি ও বসার স্থান। এসব ছাউনিতে ক্লান্ত দর্শনার্থীরা বিশ্রাম নিচ্ছেন। বৌদ্ধ মন্দির এলাকায় রয়েছে পুরাতন ঢঙে নির্মিত একটি পুকুর, মনোরম পাথওয়ে ও সেতু। তবে মন্দিরের চূড়ায় উঠার কাঠের সিঁড়িটি বর্তমানে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এ নিয়ে দর্শনার্থীদের মধ্যে কিছুটা আক্ষেপও লক্ষ্য করা গেছে।
দর্শনার্থীদের অনুভূতি
বিভিন্ন জায়গার ভ্রমণ প্রিয়াসি দর্শনার্থীদের সাথে কথা বললে তারা বলেন, ঐতিহাসিক বৌদ্ধ বিহার পাহাড়পুরের নাম আমরা অনেক শুনেছি ও জেনেছি কিন্তু সময়ের অভাবে এটি বাস্তবে দেখার সময় হয়নি। আর এ বছর ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে এসে বাস্তবে এতো সুন্দর দৃশ্য দেখে খুব ভাল লাগছে।
সিরাজগঞ্জের আলতাফ বলেন, “আমরা ৩০ জন বন্ধু ১৫টি মোটরসাইকেল নিয়ে এখানে এসেছি। জায়গাটা যেমন ঐতিহাসিক, তেমনি শান্ত ও সুন্দর।” আমাদের খুব ভালো লাগছে।
ঢাকায় বসবাসকারী আসলাম হোসেন বলেন, “পরিবারের সব সদস্যরা অনেক দিন থেকে পাহাড়পুর ঘুরতে চাচ্ছিল, সময় হয়ে উঠেনা, তাই এবার ঈদের আনন্দ বাড়াতে এখানে চলে এসেছি।”
ভ্রমণপিপাসু রানা, ইমন ও তুষার বলেন, অনেকদিন ধরেই এখানে আসার ইচ্ছা ছিল। এবার এসে সত্যিই অভিভূত হয়েছি-এত বছরের পুরনো স্থাপনা এত ভালোভাবে টিকে আছে দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি।
দর্শনার্থী বিউটি, বৃষ্টি, জেরিন, শারমিন, মেঘ ও রুনা সহ অনেকেই বলেন, আমরা এখানে এর আগে বহুবার এসেছি । কিন্তু এবার এখানে এসে মনে হচ্ছে নতুন এক বৌদ্ধ বিহার পাহাড়পুরকে দেখছি ও পুরো পাহাড়পুরটি পরিদর্শন করে আমরা খুবই আনন্দ পেয়েছি ।
বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও প্রাণচাঞ্চল্য দর্শনার্থীদের আগমন উপলক্ষে বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুর সংলগ্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ কসমেটিস ও ঝিনুকের দোকানগুলো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন বর্ণিল সাজে সাজিয়েছেন দোকানিরা।
দোকানিরা জানান, ঈদের ৫ থেকে ৭ দিন এই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়, এবং প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার দর্শনার্থী এখানে ঘুরতে আসেন।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষের মতামত
পাহাড়পুর জাদুঘরের কাস্টডিয়ান ফজলুল করিম আরজু বলেন, গতবারের চেয়ে এবার ঈদে দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। নিরাপত্তা ও যাতায়াতব্যবস্থা ভালো থাকায় দর্শনার্থীরা সহজেই এখানে আসতে পেরেছেন। আমরা পর্যাপ্ত বিশ্রামস্থল তৈরি করেছি যাতে দর্শনার্থীরা আরাম বোধ করতে পারেন। তিনি আরো বলেন, চেষ্টা করছি আগামী ঈদুল আযাহার আগে পাহাড়পুরের নতুন রাস্তাটি খুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। রাস্তাটি খুলে দিলে দর্শনার্থীরা আরো এক নতুন পাহাড়পুরকে উপভোগ করবে বলে আশ করছি।


